সর্বশেষ সমাচার

মানব ভুমি

.$posted_by. মোঃ শহর আলী 04.Jul.2019; 03:45:27

এক

বৃহস্পতিবার রাত্রে ঘুমটা আসিতেই চাহে না। পরের দিন অফিস নাই বলিয়া কি করি না করি করিতে করিতে রাত তিন চারটা বাজিয়া তবে চোখের পাতা জোড়া লাগে। কি আর করিব? করিবার ছিল বহু কিছুই, কিন্তু তাহা বাস্তবে সম্ভব হয় নাই। বলা যায় নিজের অলসতার কারণে অথবা নিজের যোগ্যতার অভাবেই।

সেই ছোট বেলায় তৃতীয শ্রেণীতে পড়িবার কালে ছড়া লিখিতাম! ষষ্ট শ্রেণীতে যখন পড়ি তখন প্রথম কবিতা লিখিয়াছি, সনেট লিখেছি নবম শ্রেণীতে। আশা ছিল এস এস সি পরীক্ষা শেষ হইলে একটা সময় পাওয়া যাইবে ইচ্ছামতো লেখা লেখি করিবার। কলেজের মেগাজিনে কবিতা ছাপানো কিংবা উপজেলা সাহিত্য পরিষদের বার্ষিকীতে লেখা প্রকাশ হইলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করিয়া ফেলিয়া ও আমার সেই লেখা লেখি করা হইয়া উঠিল না। তখন ভাবিলাম যেনতেন একটা চাকুরি জোগাড় হইলেই লেখলেখি পুরোদমে শুরু করিয়া দিতে হইবে। চাকুরী হইল, বিবাহ হইল, বাবা হইলাম কিন্তু অদ্যাবদি সেই পুরোদমে লেখা শুরু করা তো দূরে কথা, লেখালেখিটাই ভুলিয়া গিয়াছি বলিয়া মনে হইতেছে। নাহ! আমাকে দিয়া আর কিছুই হইল না।

যখন গ্রামে থাকিতাম তখনকার কথা মনে পড়ে খুব। হায়রে গ্রাম! এখন উহা শহরের রূপ পরিগ্রহ করিতেছে। বর্ষাকালে সারাদিন বৃষ্টি হইলে ঘরের বাহিরে যাওয়া অসম্ভব হইয়া পড়িত। বসিয়া বই পড়িতে পড়িতে হঠাৎ করিয়া কোথায় যেন ডুবিয়া যাইতাম। হয়তো ঘন্টার পর ঘন্টা ডুবিয়া থাকিতাম প্রকৃতির নেশার জগতে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ, খালে ব্যাঙের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর গান, ঝিঝি পোকার আওয়াজ, বাঁশের পাতার শব্দ কোথায় যেন আমাকে টানিয়া লইয়া যাইতো। ঘুরিয়া আসিতাম বনে বাদাড়ে, পাহাড়ে, নদীতে, পর্বতের গুহায় সেই আদিম মানুষের বসতঘরে। নদীতে ধরিতাম রূপালি ইলিশ, ভিজিয়া শরীর কাঁপিতে লাগিতো পদ্মা নদীর মাঝির সেই কুবেরের মতো। পাহাড়ী ঝরনার ধারে বসিয়া বসিয়া ছোট মাছের বিচরণ দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যা হইয়া যাইতো। বাংলার আদিম কোন এক গ্রামে ঘুরিয়া আসিতাম যেখানে মোড়লের বাড়ির বেড়াহীন কাছারী ঘরে গ্রামের বৃদ্ধরা বসিয়া হুক্কা টানিতে টানিতে গল্প করিতো। বিলের ধারে ছোট্ট খালে ভেসালে সারা রাত মাছ ধরিতো জেলে, আমিও মাছ ধরেছি কতকাল পড়ার টেবিলে বসিয়া বসিয়া!


আরও পড়ুন : আজকে না হয় নাই হল
আরও পড়ুন : জল ছাড়া বৃষ্টি

এখন আর প্রকৃতি আমাকে টানে না। এখানে ইটের ঘরে, ইটের রাস্তায় উহা হারাইয়া গিয়াছে। আকাশে তাকাইয়া মেঘের ভিতরে কারো মুখ আর দেখিতে পাইনা। জোৎস্না রাত কখন আসে কখন চলিয়া যায় টের পাই না। কলেজে পড়াকালে ভরা বর্ষায় পূর্ণিমার রাতে জেলে পাড়া হইতে নৌকা লইয়া বন্ধুরা নদীতে নৌকা বাইতে বাইতে চলিয়া যাইতাম পল্লীকবি জসিম উদ্দিনের বাড়ির সামনে। রাত দুইটায় আড্ডা দিতে চলিয়া যাইতাম গোবিন্দপুরের শ্মশ্বানে, হাল্কা ভয়ে শরীরের শিহরণ জাগিয়া উঠিতো। এখন আর এসবে আমাকে টানে না। ঘুমাইবার আগে মাঝে মাঝে ঘুরিয়া আসি দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা জনগোষ্ঠীর গ্রামে, কিংবা পলিনেশিয়ার বৃষ্টিবহুল বনভূমিতে। কখনো ঘুরিয়া আসি মধ্য এশিয়ার উইঘুরদের গ্রামে, কখনো বা নাগাল্যান্ডের মানুষখেকো কোন নৃগোষ্ঠীদের বাড়িতে।

কতকিছুই দেখিলাম এই ছোট্ট জীবনে। কতকিছুই তো দেখিলাম পিতার চোখে যার সবকিছু পড়িতে পারি নাই ভালভাবে। আরো কতকিছু দেখিলাম বিছানায় শুইয়া ছাদের পর্দায়। দেখিবার পরিমাণ যত নগন্যই হোক না কেন, যতদিন বাঁচিয়া থাকি, দিবারাত্রি লেখিলেও এই জীবনে তাহা লিখিয়া শেষ করিতে পারিবো না। অগত্যা লেখার বিকল্প নাই বলিয়াই মনে হইল।

 

 

এ বিষয়ে আরো খবর