এমএস আলী নিয়ে এসেছেন চারটি বই
এবারের বইমেলায় এসেছে এমএস আলী-র চারটি বই
ভোটের আগের রাতেই অশান্তি শুরু: কোথাও বোমা, কোথাও গুলি
জঙ্গিদের নিশানায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি: টুঙ্গিপাড়ায় ঝটিকা অভিযানের মহাপরিকল্পনা
সারাদেশে শয়তানের খোঁজ চলছে, ধরা পড়ল কত!
১০ নভেম্বর আওয়ামীলীগের বিক্ষোভ কর্মসূচী ঘোষনা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের ‘কিশোর গ্যাং বলল আওয়ামীলীগ
এই আন্দোলন এখন নিরীহ মানুষ হত্যার বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন
১০ শতাংশ ভোটার কমাতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি
মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন: কেঁদে কেঁদে মিজান বললেন, ‘জাতির কাছে বিচার দিতে এসেছি’
মোঃ শহর আলী 23.Feb.2026; 11:19:18
লেখক এমএস আলী একুশে বইমেলা ২০২৬ এ নিয়ে এসেছেন তার মনস্তাত্ত্বিক প্রবন্ধ চেতনার নেপথ্যে।
লেখকের মতামত-
আমি ভাবছি—আমরা কি সত্যিই নিজেদের মতো করে ভাবি?
নাকি আমরা কেবল অন্যের ভাবনাগুলো একটু সাজিয়ে নিজের নামে চালাই?
এই প্রশ্নটা প্রথমে আমাকে খুব অস্বস্তিতে ফেলেছিল। কারণ প্রশ্নটা বাইরে কাউকে নয়, সরাসরি আমাকে লক্ষ্য করে করা। আমি যতবার নিজের সিদ্ধান্তের দিকে তাকাই, ততবারই একটা অদ্ভুত দ্বিধা কাজ করে—এই সিদ্ধান্তটা কি সত্যিই আমার? নাকি এটা আমার পরিবার, শিক্ষা, সমাজ, সময় কিংবা ভিড়ের কোনো পুরোনো প্রোগ্রামিংয়ের ফল?
আমার কথা হলো—আমরা বেশিরভাগ সময় স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা নিয়ে খুব কমই প্রশ্ন করি। আমরা শরীরের স্বাধীনতা চাই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই, ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা চাই; কিন্তু নিজের বিশ্বাসগুলো কোথা থেকে এলো, কেন এলো, আদৌ সেগুলো যাচাই করা দরকার কি না—এই জায়গাটায় আমরা আশ্চর্য রকমের নীরব।
এই বইটা সেই নীরবতার ভেতরে ঢোকার একটি চেষ্টা।
আমি কোনো দার্শনিক নই, অন্তত সেই অর্থে নই যে আমার কাছে চূড়ান্ত উত্তর আছে। আমি বরং একজন পর্যবেক্ষক—নিজের মনকেই আগে পর্যবেক্ষণ করেছি, তারপর আশেপাশের মানুষগুলোকে। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে আমার কাছে যেটা পরিষ্কার হয়েছে, তা হলো: আমরা নিজেদের যতটা মুক্ত ভাবি, আসলে ততটা নই। আবার যতটা বন্দি ভাবি, ততটাও নই। আমরা এক ধরনের মাঝামাঝি অবস্থায় বাস করি—যেখানে স্বাধীনতার ভ্রম আছে, কিন্তু সার্বভৌমত্ব নেই।
আমি মনে করি, আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিই, তার পেছনে আমাদের অজান্তেই কাজ করে যায় অসংখ্য অদৃশ্য শক্তি। শৈশবের প্রশিক্ষণ, সামাজিক স্বীকৃতির লোভ, নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মোহ, প্রযুক্তির ডোপামিন-চক্র, আর সবচেয়ে ভয়ংকর—ভিড়ের সাথে একাত্ম হওয়ার নিরাপদ স্বস্তি।
আমার ভাবনায়, সবচেয়ে বড় দাসত্ব শিকল বা শাস্তি দিয়ে আসে না। আসে স্বাভাবিকতার ছদ্মবেশে। যখন একটা বিশ্বাস এতটাই সাধারণ হয়ে যায় যে তাকে আর প্রশ্ন করার প্রয়োজন বোধ করি না—সেখানেই শুরু হয় প্রকৃত বন্দিত্ব।
এই বই কোনো তাত্ত্বিক দর্শনের পাঠ্য নয়। এখানে আপনি হয়তো কোনো নতুন সূত্র, কোনো নতুন মতবাদ বা কোনো ‘মন্ত্র’ পাবেন না। বরং আপনি পাবেন কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন। এমন প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর হয়তো সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে না। এমন প্রশ্ন, যেগুলো একা একা ভাবতে হবে। কখনো নিজেকে অপছন্দ করে, কখনো নিজের ওপর হেসে।
আমি প্রায়ই ভাবি, আমরা অন্যের ভুল খুব সহজে ধরতে পারি, কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে গেলেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অন্যের কুসংস্কার আমাদের চোখে পড়ে, কিন্তু নিজের সংস্কারকে আমরা ‘মূল্যবোধ’ বলে সাজিয়ে রাখি। এই দ্বৈততা আমাকে বারবার ভাবিয়েছে—আমরা কি আদৌ সত্যকে ভালোবাসি, নাকি কেবল নিজের আরামকে ভালোবাসি?
এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় সেই আরামের বিরুদ্ধে ছোট্ট একটি ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা। কোথাও ব্যঙ্গ আছে, কিন্তু সেটা কাউকে ছোট করার জন্য নয়—বরং নিজের ভেতরের ভণ্ডামিটাকে চিনতে সাহায্য করার জন্য। কোথাও রূপক আছে, কারণ সরাসরি কথা বললে অনেক সময় মন দরজা বন্ধ করে দেয়। আবার কোথাও আত্মস্বীকার আছে, কারণ আমি বিশ্বাস করি—লেখক যখন নিজের মুখোশ খোলে, পাঠক তখন নিজেরটা খুলতে সাহস পায়।
আমি পাঠককে কোনো নতুন পরিচয় দিতে চাই না। বরং তার পুরোনো পরিচয়গুলো একটু নড়বড়ে করে দিতে চাই। কারণ আমার কাছে মনে হয়, মানুষ বদলায় না নতুন কিছু জানার মাধ্যমে; বদলায় পুরোনো নিশ্চিততার ফাটল ধরার মধ্য দিয়ে।
এই গ্রন্থ সচেতন নাগরিকদের জন্য লেখা—কিন্তু সচেতনতার সংজ্ঞা আমি এখানে আলাদা করে দিচ্ছি। সচেতন মানে সব জানে—এমন নয়। সচেতন মানে নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সৎ। সচেতন মানে ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে।
আমি জানি, এই বই পড়ে সবাই স্বস্তি পাবে না। কেউ কেউ বিরক্ত হবে, কেউ কেউ দ্বিমত করবে, কেউ কেউ হয়তো বইটা বন্ধ করে রাখবে কিছুদিন। আমার কাছে সেটাও গ্রহণযোগ্য। কারণ এই বইয়ের উদ্দেশ্য কাউকে সন্তুষ্ট করা নয়—চিন্তাকে একটু নড়ানো।
আমার শেষ কথা আপাতত এটুকুই—
আপনি যদি এই বইয়ের পাতায় পাতায় নিজের সাথে তর্ক করতে প্রস্তুত থাকেন, যদি নিজের বিশ্বাসকে অন্তত একবার কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে রাজি থাকেন, তাহলে এই যাত্রা আপনার জন্য।আরও পড়ুন : বাসি ফুলের মালা আরও পড়ুন : এমএস আলী-র উপন্যাস ’বিলয় পরশ’
চেনা জানালার ওপারে যে অসীম আকাশ আছে—আমি শুধু জানালার কাঁচে একবার আলতো টোকা দিতে চাই।
ভাঙবেন কি না, সেটা পুরোপুরি আপনার সিদ্ধান্ত।
আমি মনে করি—সার্বভৌমত্বের শুরু হয় ঠিক এখান থেকেই।