সর্বশেষ সমাচার

এডিসি হারুনের পরিবার বিএনপি-জামায়াত: রাব্বানী

.$posted_by. তাহসিনা তাবাসসুম 10.Sep.2023; 10:10:47

ছাত্রলীগের দুই নেতাকে থানায় নিয়ে বেধড়ক পিটুনির ঘটনায় অভিযুক্ত রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) হারুন অর রশিদের পরিবারের সবাই ‘বিএনপি-জামায়াত সমর্থক’ বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। ঢাকা টাইমস

রবিবার (১০ সেপ্টেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এমনটা দাবি করেছেন তিনি।

এডিসি হারুনের পরিচয় ও গ্রামের বাড়ির উল্লেখ করে গোলাম বাব্বানী জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের এডিসি হারুন অর রশিদের বাবার নাম জামাল উদ্দিন গাজী। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা ইউনিয়নের থানাঘাটা গ্রামে।
গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘হারুন সাহেবের পিতা মাড়িয়ালা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আশাশুনি এর ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জামাল উদ্দিন ও মাতা শেফালী বেগম উভয়ই জামায়াত সমর্থক। নানা মৃত বাবর আলী সানা একজন মুসলিম লীগার ও সক্রিয় জামায়াত নেতা ছিলেন। মামা হুমায়ুন কবির ও মিলন বিএনপি সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া বাবা ও মায়ের পরিবারের সকল সদস্যগণ বিএনপি-জামায়াত সমর্থক।’

ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর জিয়া হল ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোস্তাকের রুমমেট ছিলেন (কক্ষ নং- ৩১০) এবং তার সাথে সক্রিয়ভাবে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে জিয়া হলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে ছাত্রলীগ তকমা লাগান।’

এডিসি হারুনকে অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘তিনি একজন অনুপ্রবেশকারী হিসেবে নিজের আখের গোছানোসহ আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি বিনষ্টে গোপনে কাজ পরিচালনা করছেন বলে স্পষ্ট প্রতীয়মান। জামায়াত-বিএনপি পরিবারে একজন সদস্য ও ছাত্রদল কর্মী কিভাবে ডিএমপির গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়িত হয়ে ছাত্রলীগ নেতাসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর গুলি চালানো, পাশবিক নির্যাতনসহ সরকারকে বিব্রত ও বেকায়দায় ফেলতে ক্রমাগত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছেন, তা নিয়ে স্থানীয় ত্যাগী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মাঝে দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ-হতাশা বিরাজমান।
ছাত্রলীগের দুই কেন্দ্রীয় নেতাকে শাহবাগ থানায় আটকে নির্মমভাবে মারধরের ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার হারুন অর রশিদকে ডিএমপি থেকে এপিবিএনে বদলি করা হয়েছে। রোববার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ বদলির আদেশ জারি করা হয়। এর আগে তাকে প্রত্যাহার করে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট ( পিওএম) উত্তর বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে।

[৩] এদিকে এ ঘটনায়  তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ডিএমপি । আগামী দুইদিনের মধ্যে তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে ডিএমপি পুলিশ কমিশনার বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

[৪] রাজধানীতে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, এটা যে করেছে, সে পুলিশের হোক বা যেই হোক না কেন, অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে। কেন করেছে, কী করেছে, আমরা জিজ্ঞাসা করবো। তার ভুল কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে। যতটুকু অন্যায় করেছেন, ততটুকু শাস্তি পাবেন ।
[৫] শনিবার রাতে নির্যাতনের শিকার দুই নেতা হলেন- কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফজলুল হক হলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন নাঈম এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাবির শহীদুল্লাহ হলের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমেদ মুনিম। এদের মধ্যে নাঈমের অবস্থা গুরুতর।

[৬] নাঈমের বন্ধু ও সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, পিটিয়ে নাঈমের প্রায় ৮ থেকে ১০টি দাঁত ভেঙে  ফেলা  হয়। তার অবস্থা গুরুতর , কথা বলতে পারছেনা। ওসির রুমে এডিসি হারুনসহ ১৫ জন পুলিশ সদস্য তাকে মারধর করেন। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

[৭] ছাত্রলীগ সূত্র জানায়, এডিসি হারুন শনিবার রাতে আরেক নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে বারডেম হাসপাতালে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওই সময় নারী কর্মকর্তার স্বামী ওই দুই ছাত্রলীগ নেতাকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যান। নারী কর্মকর্তার স্বামীও একজন সরকারি কর্মকর্তা। তার সঙ্গে এডিসি হারুনের বাক-বিতণ্ডা হয়। পরে এডিসি হারুন দুই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতাকে শাহবাগ থানায় তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেন। এরপর অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়লে ওই দুজনকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনার জেরে রাতে শাহবাগ থানার সামনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ভিড় করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও পুলিশের কর্মকর্তারা থানায় গিয়ে মধ্যরাতে ঘটনার প্রাথমিক মীমাংসা করেন। ওই নারী কর্মকর্তার সঙ্গে হারুনের র্দীঘদিন ধরে পরকীয়া চলছিলো।

[৮]  ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানেন। তদন্তে এডিসি দোষী হলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

[৯] উল্লেখ, এর আগেও এডিসি হারুনের হাতে পুলিশ সদস্য, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীসহ বিভিন্নজন লাঞ্ছিত হয়েছে। সম্পাদনা: তারিক আল বান্না
বরাবরই বেপরোয়া এই পুলিশ কর্তার আছে মানুষ পেটানোর বাতিক। বাগে পেলে কাউকেই ছাড় দেন না। মারমুখী ও উগ্র আচরণের কারণে গণমাধ্যমে বারবার জায়গা করে নেন। তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হারুন অর রশিদ।

কখনও ‘শান্তিপূর্ণ’ কর্মসূচিতে রাজপথে বিনা উস্কানিতে বিক্ষোভকারীর ওপর নির্দয় লাঠিপেটা; আবার কখনও সহকর্মীর গায়ে হাত তুলে হয়েছেন তুমুল সমালোচিত। এডিসি হারুনের ব্যাপারে ভুক্তভোগীদের মন্তব্য– মানুষ পেটানোই তাঁর নেশা!
এবার কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন নাঈম এবং শহীদুল্লাহ হলের সাধারণ সম্পাদক শরীফ আহমেদকে পিটিয়ে রক্তাক্ত ও দাঁত উপড়ে ফেলে সারাদেশে আলোচনার ঘূর্ণি বয়ে দিয়েছেন। গেল শনিবার রাতে রাজধানীর শাহবাগ থানায় ওই দুই নেতাকে আটকে নির্দয় নির্যাতনে নামেন এডিসি হারুন। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র তুমুল সমালোচনার মুখে গতকাল রোববার দুপুরে তাঁকে রমনা বিভাগ থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকার ভেতরেই পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে সংযুক্ত করা হয়। পরে বিকেলে পুলিশ সদরদপ্তর হারুনকে ঢাকার বাইরে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন) বদলি করে। এ ঘটনায় গতকাল তিন সদস্যের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ডিএমপি। এতে প্রধান করা হয়েছে ডিএমপি সদরদপ্তরের উপকমিশনারকে।

সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, যেভাবে দুই ছাত্রলীগ নেতার ওপর বর্বরতা চালিয়েছেন, তাতে হারুন এবারও ছোট শাস্তিতে পার পেয়ে যাচ্ছেন। ‘বদলি’ ‌ও ‘প্রত্যাহার’– এসব পুলিশের ‘ছোট শাস্তি’ হিসেবে বিবেচিত। এর আগেও বিভিন্ন সময় নানা অপকর্মের জন্ম দিলেও তাঁকে দেওয়া হয়নি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।

দুই নেতাকে নির্যাতনের প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদে সরব রয়েছেন ছাত্রলীগ নেতারা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আনোয়ারকে দেখতে গিয়ে ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতারা তীব্র ক্ষোভ আর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলছেন, রাতে থানায় আটকে রেখে ছাত্রলীগ নেতাদের মারধরের এ ঘটনা নজিরবিহীন। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ছাত্রদলও।

দুই ছাত্রলীগ নেতা ও প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন, থানায় আটকে মারধরে এডিসি হারুন শুধু একা নন; আরও ১০ থেকে ১৫ পুলিশ সদস্য তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তারা সবাই মিলে দুই ছাত্রলীগ নেতাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন।

ছাত্রলীগের দুই নেতাকে থানায় নিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, যতটুকু অন্যায় করেছেন, ততটুকু শাস্তি পাবেন। পুলিশ হোক, যেই হোক; অন্যায় যে করেছে, তার শাস্তি অবশ্যই হবে। বারবার এসব ঘটনা ঘটিয়েও তিনি বিচারের মুখোমুখি হননি– এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনা প্রথম উল্লেখযোগ্যভাবে এসেছে।

নির্যাতনের শিকার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নাঈম প্রথমে রাজধানীর মগবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গতকাল দুপুরে চিকিৎসাধীন ছেলের পাশে বসে কাঁদছিলেন তাঁর মা নাজমুন নাহার নাজমা। তিনি নির্যাতনকারী এডিসি হারুন অর রশিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও চাকরিচ্যুতির দাবি জানান।

হারুনের গ্রেপ্তারের দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে এমন কী দোষ করেছে যে তাকে এমন নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করতে হবে! সে তো কোনো অপরাধ করেনি। একটি ঘটনা শুনে সে থানায় গিয়েছিল। পুলিশকে সে বারবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরিচয় দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতা পরিচয় দিয়েছে। তবু হারুন তাকে বর্বর নির্যাতন করেছে। কখনও আমি ছেলের গায়ে হাত দিইনি। আজ রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায়। কথাও বলতে পারছে না। ছেলের এই কষ্ট মা হয়ে কীভাবে সহ্য করব! আল্লাহর কাছেও বিচার দিলাম।’

আনোয়ার বলেন, ‘আমার বাড়ি গাজীপুর। রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব আজিজুল হকের বাড়িও একই জায়গায়। এলাকার বড় ভাই হিসেবে তিনি আমার পূর্বপরিচিত। শনিবার সন্ধ্যার দিকে আজিজ ভাই ফোন করে শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে যেতে বলেন। রাত সোয়া ৮টার দিকে সেখানে যাই। এর পর তিনি আবার বারডেম হাসপাতালের ভেতরে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে দেখি, রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব আজিজুল ও পুলিশের এডিসি হারুনের মধ্যে তুমুল বাগ্‌বিতণ্ডা চলছে। আমি ও শরীফ তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। এরপর এডিসি হারুন শাহবাগ থানার ওসিকে ফোন করে বারডেম হাসপাতালে পুলিশ পাঠাতে বলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ১০ থেকে ১৫ পুলিশ সদস্য বারডেমে আসেন। আমাকে ও শরীফকে শাহবাগ থানায় ধরে নিয়ে যান হারুন। এর পর থানায় ওসির কক্ষে নিয়ে আমাদের মারধর করা হয়।’

আনোয়ার নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘প্রথমে হারুন পেটানো শুরু করেন। এর পর ১০ থেকে ১৫ পুলিশ সদস্য বুট, রাইফেলের বাঁট ও লাঠি দিয়ে আমাদের পেটাতে থাকেন। আমি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয় দেওয়ার পরও নির্যাতন চালাতে থাকেন। আমার ওপরেই নির্যাতন বেশি হয়েছে। দাঁত ক্ষতবিক্ষত ও ঠোঁট ফেটে যাওয়ায় তিনটি সেলাই দিতে হয়েছে।’


আরও পড়ুন : সারাদেশে শয়তানের খোঁজ চলছে, ধরা পড়ল কত!
আরও পড়ুন : ১০ নভেম্বর আওয়ামীলীগের বিক্ষোভ কর্মসূচী ঘোষনা

এরই মধ্যে খবর পেয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মী থানায় আসেন। তবে তাদের গেটের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টি জানতে পারেন। এর পরই নিউমার্কেট জোনের এডিসি শাহেন শাহসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তা শাহবাগ থানায় যান। আনোয়ার মেঝেতে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন। তখন একজন এডিসির গাড়িতে করে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।’

আনোয়ার জানান, শরীফকে ছেড়ে দিলে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। আনোয়ারের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁকে রাতেই মগবাজারের সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে গতকাল বিকেলে তাঁকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)  হাসপাতালে নেওয়া হয়। গতকাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আনোয়ারের মাথা, চোখ ও ঠোঁট বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না। গতকাল রাতে আনোয়ারকে দেখতে বিএসএমএমইউতে যান আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম।

শরীফ সমকালকে বলেন, ‘প্রথমে এডিসি হারুন আমাদের পেটায়। অন্য পুলিশ সদস্যরা আনোয়ারকে বুট ও রাইফেলের বাঁট দিয়ে মারতে থাকে। সাত-আট মিনিট একনাগারে পেটায়। আনোয়ার মেঝেতে পড়ে ছিল।’

জানা গেছে, রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব আজিজুল হকের স্ত্রীও ডিএমপির একজন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার। তিনি ৩৩তম বিসিএসের কর্মকর্তা। পুলিশ, ভুক্তভোগী ও ছাত্রলীগের নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, শনিবার আজিজুল হকের স্ত্রীর সঙ্গে বারডেম হাসপাতালে আড্ডা দিচ্ছিলেন এডিসি হারুন। খবর পেয়ে আজিজুল হক ছাত্রলীগ নেতাদের ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কেউ কেউ বলছেন, হারুনের সঙ্গে আজিজুল হকের স্ত্রীর এক ধরনের ‘সুসম্পর্ক’ রয়েছে। অভিযোগের ব্যাপারে এডিসি হারুন বলেন, ‘কী ঘটেছে, এ বিষয়টি আপনারা অনুসন্ধান করে বের করেন।’ ওই নারী পুলিশ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, ‘চিকিৎসার জন্য বারডেম হাসপাতালে গিয়েছিলাম। হারুন হাসপাতালে গিয়েছিলেন আমার সহকর্মী হিসেবে। হাসপাতাল তাঁর আওতাধীন এলাকা বলেই সেখানে যান তিনি।’

দুই ছাত্রলীগ নেতাকে নির্যাতনের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান সমকালকে বলেন, ‘এখানে যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি এ বিষয়ে আশু পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আমরা কর্মসূচি দেব। আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি।’

আনোয়ারের মা নাজমুন নাহার নাজমা বলেন, ‘আমার ছেলের মুখের দিকে তাকানোই যায় না। বুট জুতায় ওর মুখ থেঁতলে দিছে পুলিশের এডিসি হারুন। কী অপরাধ করছিল আমার নাঈম? আমার ছেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মী। শেখ হাসিনার জন্য নাঈম জীবন দিয়া দিতে পারে। আমার ছেলের ওপর এমন নির্যাতনের বিচার চাই শেখের বেডির কাছে।’

কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন নাজমা। তার পর তিনি বলেন, বছর ছয় আগে নাঈমের বাবা মারা গেছেন। তিনিও মানুষের কল্যাণে সারাজীবন কাজ করেছেন।  নাঈমের বাবা সব সময় চাইতেন তাঁর ছেলে বড়  নেতা হোক, মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু একটা করুক। আমার সেই ছেলেরে পুলিশ ক্যান এমন কাইরা মারলো?’

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটী ইউনিয়নের মুলাইদ গ্রামের প্রয়াত ইউপি সদস্য আলাউদ্দিন মেম্বারের পাঁচ ছেলের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা নাঈম চতুর্থ।’

পেটানোই তাঁর নেশা

হারুন এর আগেও রাজপথে আন্দোলনকারীদের বেধড়ক পিটিয়েয়েছেন। সংবাদ সংগ্রহ করায় পিটিয়েছেন সংবাদকর্মীকে। গত ৭ আগস্ট জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে শাহবাগ এলাকায় ‘শান্তিপূর্ণ’ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে লাঠিপেটা করে পুলিশ। এতে অন্তত ১২ জন আহত হন। সেদিনের ঘটনার নেতৃত্ব দেন এডিসি হারুন। তাঁর নির্দেশেই ওই দিন কর্মসূচিতে ‘বিনা উস্কানিতে’ বিক্ষোভকারীদের লাঠিপেটা করা হয়।

এর আগে গত বছরের ১৮ এপ্রিল রাতে নিজের সহকর্মীকেও চড় মেরে সমালোচিত হয়েছিলেন এডিসি হারুন। নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঢাকা কলেজের ছাত্র সংঘর্ষের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশ সদস্যদের রাবার বুলেট ছোড়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন তিনি। এ সময় ‘গুলি শেষ হয়ে গেছে’ বলায় ওই পুলিশ কনস্টেবলকে থাপ্পড় মারেন হারুন। এ নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তার এ ধরনের আচরণের নিন্দা জানান সাধারণ মানুষ। এমনকি তিনি নিজেই লাঠি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের পেটাচ্ছেন– এমন ভিডিও ফেসবুকে এর আগে ভাইরাল হয়েছিল।

যে কোনো যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলনকারীদের বেপরোয়া পেটানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানান। ওই সময় পুলিশের মারধরের শিকার হওয়া ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী দ্রুত এডিসি হারুনকে প্রত্যাহারের দাবি জানান, যা কর্ণপাত করেনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। গত ৪ মার্চ গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিলে ঢাকা ক্লাবের সামনে এডিসি হারুনের নেতৃত্বে অতর্কিতে হামলা চালায় একদল পুলিশ সদস্য। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এডিসি হারুনের নেতৃত্বে পুলিশ ছাত্রদলের ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাবেশে হামলা চালায়।

২০২১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে বিচার চেয়ে শাহবাগে প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও অন্য বাম সংগঠন আয়োজিত মশাল মিছিলে লাঠিপেটা করে পুলিশ। এরও নেতৃত্বে ছিলেন এডিসি হারুন। ২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ মোড়ে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করার দাবিতে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। সেখানে চাকরিপ্রত্যাশী কয়েকজনের ওপর লাঠিপেটা করেন এডিসি হারুন। পরে এক যুবককে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় ছবি তুলতে গেলে কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে এডিসি হারুন দুর্ব্যবহার করেন।

রোববার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, এডিসি হারুনের বিষয়টি ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানে। এটি তদন্ত করা হবে। তদন্তে এডিসি দোষী হলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শনিবারের ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আমার কক্ষে কাউকে নির্যাতন করা হয়নি। ঘটনাটি ঘটেছে পরিদর্শকের (তদন্ত) কক্ষে। ঘটনার সময় আমি থানাতেই ছিলাম না।’

জানা গেছে, সমালোচিত-আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুনের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। তাঁর বাবা জামাল উদ্দিন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। হারুন তাঁর মামাবাড়িতে বড় হয়েছেন। তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন তিনি। ক্যাম্পাস ক্যান্টিনে ফাও খাওয়া ও মাদকের সঙ্গেও তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে আরো খবর