সর্বশেষ সমাচার

জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতা

.$posted_by. মোঃ শহর আলী 01.Jun.2019; 05:19:11

মানুষদের মাথার আকৃতি প্রায় একই রকম হলেও তার ভিতরে অবস্থিত মগজে যথেষ্ট ভিন্নতা আছে। আর এই মগজ বা মস্তিষ্ক মানুষের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে।

মস্তিষ্ককে বলা যায় শরীরের রাজধানী। শরীরের যে কোন অঙ্গে যে কোন সমস্যা হলে তার খবর মস্তিষ্কে পৌছে যায়। মস্তিষ্ক তার তথ্য, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

মস্তিষ্ক বিভিন্নভাবে কাজ করে। তবে তা প্রধানত দুই প্রকার: যথা- প্রত্যক্ষ ভাবে ও পরোক্ষভাবে।

মস্তিষ্ক যখন বিচার বুদ্ধির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহন করে তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে কাজের নির্দেশ দেয় তখন তা প্রত্যক্ষভাবে করে ‍থাকে। যেমন, আপনার বন্ধুর সাথে দেখা হলে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ বন্ধু?  এই কাজটি আপনার মস্তিষ্ক প্রত্যক্ষভাবে করেছে। আপনার পায়ে মশা কাপড় দিয়েছে, আপনার হাত সেখানে গিয়ে একটা থাপ্পড় মেরেছে। যদি আপনার সিদ্ধান্ত ছাড়া আপনার অজান্তে এই কাজটি হয়ে থাকে তবে তা মস্তিষ্কের পরোক্ষ কাজ। আরো ভাল উদারণ হতে পারে ঘুমের মধ্যে যদি আপনার হাত এই কাজটি করে।

জ্ঞান কি? জ্ঞান হচ্ছে কতগুলো তথ্য যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। শুধু তথ্যভান্ডার কোন জ্ঞান নয়। এই তথ্যকে ব্যবহার করে মস্তিষ্ক যদি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তবে তাকে জ্ঞান বলা যায়। কাজেই জ্ঞানী হওয়ার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে প্রচুর পরিমাণ তথ্য ধারণ করা প্রয়োজন।

প্রজ্ঞা? প্রজ্ঞা হচ্ছে সেই সিদ্ধান্ত যা মস্তিষ্ক নিজের যোগ্যতায় নিয়ে থাকে। কোন প্রকার তথ্য ছাড়াই, অথবা উপযুক্ত তথ্যের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও মস্তিষ্ক এই সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে থাকে। যদি গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো পরবর্তীতে সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় তবে আপনাকে প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি বলা যায়। এরুপ সিদ্ধান্ত নেয়ার যোগ্যতা সবার সমান থাকে না। যার প্রজ্ঞা বেশি তিনি বিশেষ মুহুর্তে ভাল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন।

সৃজনশীলতা কি? সৃজনশীলতা হচ্ছে নতুন কিছু করার যোগ্যতা। আপনার মস্তিষ্ক এমন কিছু করতে চায় যা অন্য কেউ এভাবে করেনি বা ভাবেনি। যদি আপনি যা করতে চান তা বিশ্বের অন্য প্রান্তে কেউ না কেউ করে থাকে বা ভেবে থাকে তাতে কিছু যায় আসে না। তাদের মতো আপনিও একজন সৃজনশীল মানুষ।

কাজের ক্ষেত্রের কথা বলি। জ্ঞানী লোকদের দিয়ে সবধরনের কাজই করানো সম্ভব। তাদেরকে যে কোন কাজ একবার শিখিয়ে দিলে তারা খুব ভালভাবেই কাজটি চালিয়ে নিতে পারবেন।

কিন্তু একজন প্রজ্ঞাবান মানুষ শুধু কাজই ভাল করতে পারেন না, তিনি ভাল সিদ্ধান্তও নিতে পারেন। প্রজ্ঞাহীন জ্ঞানী ব্যক্তি শুধুমাত্র জানা কাজগুলো এক নাগাড়ে করে যেতে পারবেন। প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির যে কাজটি জানা আছে তিনি সেই কাজটি আরো সুন্দর ভাবে, অন্যভাবে, যথাসময়ে, প্রচূর পরিমাণে করতে পারেন ও করাতে পারেন। কাজেই বলা যায় প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণই কেবল নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য।

একজন সৃজনশীল ব্যক্তি কোনো কাজ জানা সত্বেও তা এক নাগাড়ে তা করতে পারবেন না। যন্ত্রের মতো একটি কাজ করতে থাকা তার মস্তিষ্ক পছন্দ করে না। সৃজনশীল মস্তিষ্ক কাজ করে না, কাজ সৃষ্টি করে, নতুন কাজ আবিষ্কার করে অন্যদের শিখিয়ে থাকে।

কাজেই যে কোন টীমে জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান ও সৃজনশীল এই তিন ধরনের লোক থাকলে টীমের কাজ অনেক সুন্দর হয় ও লক্ষ্যে পৌছতে পারে। সেখানে জ্ঞানীগণ ভাল কাজ করতে পারেন, প্রজ্ঞাবানেরা দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন আর সৃজনশীলেরা নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আসতে পারেন।

তাহলে বলা যায়, বিশ্বের বড় বড় ধনী লোকেরা জ্ঞানী তবে প্রজ্ঞাবান ও হয়ে থাকতে পারেন। বড় নেতাগণ অবশ্যই প্রজ্ঞাবান তবে জ্ঞানী নাও হয়ে থাকতে পারেন। বড় বড়  বিজ্ঞানী গণ, কবি সাহিত্যিকগণ সৃজনশীল ও জ্ঞানী তবে প্রজ্ঞাবান নাও হয়ে থাকতে পারেন।


আরও পড়ুন : ছাত্র-জনতা পরিষদ নামে কী নতুন রাজনৈতিক দলের জন্ম হচ্ছে?
আরও পড়ুন : সাপের নাম রাসেল ভাইপার কেন

জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবানদের যথেষ্ট সময় জ্ঞান থাকে। তারা দায়িত্বশীল, ধৈর্যশীল ও নিষ্ঠাবান। কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষ এগুলোর তোয়াক্কা করেন না। তিনি কখন খাবেন, কখন ঘুমাবেন, তার বাসায় কি বাজার করা প্রয়োজন এসব তার মনে থাকে না।

জ্ঞানীরা একটি কাজ নিষ্ঠার সাথে করতে থাকবেন। একজন সৃজনশীল মানুষ সেই কাজটি দশজনকে দিয়ে না করিয়ে একজনকে দিয়ে করানো যায় কিনা সেই পথ বের করার কথা ভাববেন। হয়তো বা এটাও ভাবতে পারেন যে, কাজটি করার দরকার কি? এর একটি সহজ বিকল্প তো আছে!

জ্ঞানীরা তাদের অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে তার কাজের একটি রুটিন তৈরি করবেন। তার জীবনেরও একটি রুটিন তৈরি করবেন। সেই রুটিন অনুযায়ী সবকিছু করবেন। রুটিনের বাইরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। একজন সৃজনশীল মানুষের কোন রুটিন নাই। হঠাৎ তার মনে হলো এই কাজটি করা উচিত তিনি সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। অন্যদিকে তার অনেক কিছুই পড়ে থাকবে সেদিকে খেয়াল নেই।

জ্ঞানীরা একটি জ্ঞান চক্র বা জ্ঞান বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ থাকেন। তাদের মূল্যবোধের জায়গাটাও সেই বৃত্তের মধ্যেই আবদ্ধ। কিন্তু সৃজনশীল মানুষ তার জ্ঞান বৃত্তের বাইরে বের হয়ে আসতে পারেন, আবা সেই বৃত্তে ঢুকতেও পারেন।

যেমন, একজন জ্ঞানী মুসলিম ব্যক্তি সর্বদা মুসলমানদের পক্ষেই কথা বলবে, একজন জ্ঞানী খ্রিস্টান ব্যক্তি সর্বদা খ্রিস্টানদের পক্ষেই কথা বলবে। কিন্তু একজন সৃজনশীল মানুষ তিনি যে ধর্মের লোকই হোন না কেন, সকল মানুষের জন্যই কথা বলবেন, সবার জন্যই কাজ করবেন।

জ্ঞানী লোকদের ধর্ম থাকে, জাতি থাকে, গোত্র থাকে, বর্ণ থাকে, সৌন্দর্যবোধ থাকে, সমাজ থাকে, বন্ধু থাকে, আত্মীয় থাকে, শিক্ষা থাকে, অর্থ থাকে ইত্যাদি। একজন সৃজনশীল মানুষের এসবের কিছু কিছু থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে, এগুলো তার কাছে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।

একজন জ্ঞানী লোকের ভালবাসা থাকে, সৃজনশীল মানুষ ভালবাসা কিসের উপর দায়িয়ে থাকে তার ভিত্তি খুঁজেন। একজন জ্ঞানী ব্যাক্তি প্রচুর অর্থ ও সম্মান অর্জন করতে চান। সৃজনশীল ব্যক্তি মানুষের, সমাজের ও রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা ভাবেন।

 

এ বিষয়ে আরো খবর