সর্বশেষ খবর

ছোটগল্প

এস,জে,কে বব্রু বাঁধন সিংহ 11.Oct.2019; 09:31:38

অসম্পূর্ণ বাসনা

---এস,জে,কে বব্রু বাঁধন সিংহ

(গল্পটিতে সকল ক্ষেত্রে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে)

 

প্রত্যেকটি মানুষের জীবনেই কিছু না কিছু স্মৃতি বিস্মৃতি থাকে যেগুলো চিরস্মরণীয়। যে স্মৃতিগুলো মনে পড়লে আমরা প্রত্যেকেই অনেক আবেগপ্রবণ হয়ে যাই ; ফিরে যেতে চাই সেই সোনালি দিন গুলতে । কতই না সুন্দর ছিল সেই দিনগুলি!

সেই ছোটবেলার কথা। আমি যখন অনেক ছোট ;এই যখন আমার জ্ঞানবোধটুকু জাগ্রত হয়েছে কেবল তখনকার কথা। আর এই মুহূর্তে আমি জীবনের মাঝ নদীতে অবস্থান করছি। আমি গ্রামে থাকতাম । অনেক মজা করতাম বন্ধুদের সাথে । আমার সব বন্ধুবান্ধবদের বাড়িও একই গ্রামে ছিল । আমরা একসাথে স্কুলে যেতাম,খেলাধুলা করতাম, মাছ ধরতে যেতাম, ঘুড়ি উড়াতাম আরো কত কি! চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় একদিন আমরা বন্ধু বান্ধবরা মিলে আমাদের পাশের গ্রামে কমল দাদার আম বাগানে আম চুরি করতে গিয়েছি, আর সেদিন ছিল খুব বৃষ্টি ,আমরা ভেবেছিলাম কেউ আসবেনা, আমি আর আমার বন্ধু সজল গাছে উঠেছি আম পাড়ানোর জন্য , যেই না কয়েকটি আম পেরেছি অমনি ঐ মুহূর্তে কমল দাদা ছাতা নিয়ে এসে দেখে আমরা ছেলেপেলেরাবাম চুরি করছি ; যেই দেখা আমরা দৌড়, কমল দাদাও আমাদের পিছন পিছন দৌড়, তিনি দৌড়াতে গিয়ে কাদায় পিছলে পড়ে ছাতাটা ফেললেন ভেঙ্গে । আমাদের তাই দেখে কি হাসি! বিকেল বেলা আমরা বন্ধু-বান্ধবীরা মিলে গোল্লাছুট, বৌ-চি ,দাঁড়িবান্ধা খেলতাম , কখন যে সুর্যাস্ত হয় টেরই পেতাম না , বাড়িতে গিয়ে মায়ের বকুনি খেতাম । বলত এত বেলায় কেউ খেলে। এভাবেই কেটে যেত আমার দিনগুলি।

 

চার বছর পেরিয়ে আমি এখন অষ্টম শ্রেণিতে। শ্রেণিতে সব বন্ধু-বান্ধব্দের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল । তো প্রত্যেকটি মানুষেরই কারো না কারোর সাথে বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে । সেরকম আমার এক বান্ধবীর সাথে খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। আমারা এক সাথেই বিদ্যালয় জীবনটা কাটিয়েছি। পড়াশুনার ব্যাপারে সে কোন সমস্যায় পড়লে আমি তাকে অনেক সাহায্য করতাম, আমার কোন সমস্যা হলে সে সাহায্য করতো আমাকে। সেই সুবাদে আমাদের দুজনের বাড়িতে দুজনার যাতায়ত ছিল এবং তার পরিবারের সাথে আমার পরিবারের একটা সুসম্পর্ক তৈরি হয়। স্কুল জীবন শেষে আমরা দুজনে আবার সৌভাগ্যক্রমে একই কলেজে ভর্তি হলাম। আমি রামেন্দ্রপুর কলেজে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী আর সে ছিল ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী। এই কলেজে অধ্যয়নরত অবস্থায় আমার মনের মধ্যে যে কি যেন একটা কাজ করছিল যে তার প্রতি আমার দুর্বলতা বেড়ে যাচ্ছিল । তাকে না দেখলে অস্থির লাগতো , তার সাথে কথা না বললে ভালো লাগতো না । আমাদের ঐ সময়টাতে বর্তমান সময়কার মত এত আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। তাই আমাদের মধ্যে যোগাযোগ হতো চিঠি আদান প্রদানের মাধ্যমে । চিঠি লিখাও একটা শিল্প। যে কেউ অতি সহজে চিঠি লিখতে পারে না। এটি মানে ভালোবাসা মিশ্রিত, আবেগঘন ও শৈল্পিক গুণ দিয়ে লেখা এত সহজ নয়। আমার মাসিতো ভাই বিবেক। সে আমার চিঠিগুলো নিয়ে তাকে দিতো। এত কিছুই যখন বললাম তো আমার বান্ধবীর নামটা বলেই ফেলি । তার নাম ছিল রেখা। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে, ফলাফলে আমার থেকে রেখা একটু বেশি ভাল ফল করে। অতঃপর আমরা দুজনে এখন ভর্তি যুদ্ধে মানে সম্মানে পড়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যা ই বলি না কেন আমরা দু’জনেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলাম কিন্তু এখানেও দুজনে আলাদা দুই বিষয়ে অধ্যয়নরত ছিলাম। এই ক্যাম্পাসে আমাদের সখ্যতাটা আরো একটু বেড়ে গিয়েছিল। দু’জনে যদি গল্প করতে বসতাম কখন যে সকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত বুজতেই পেতাম না। প্রতিদিন দেখা করার সময় আমি তার জন্যে একটি তরতাজা রজনীগন্ধা এবং রেখা আমার জন্য একটি গোলাপ নিয়ে আসতো। ফুল আদান প্রদানের সময় দু’জন দুজনার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছি। যে কথাটি আমি তাকে বলবো বলবো ভাবেছি সে কথাটি বলা হয়ে ওঠে না। আমার মনের মধ্যে একটা অজানা বাসনা জাগ্রত হয়ে ওঠে । আমি কোনদিন ভাবিনি যে রেখার প্রতি আমার এই অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্ট হবে ।

হঠাৎ একদিন জানতে পারি যে রেখাড় একটি সরকারি চাকুরী হয়েছে। চাকুরীর কথা শুনে আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। চাকুরীর সুবাদে রেখা ক্যাম্পাসে আসা কমিয়ে দেয়। আমাদের মধ্যে একটা দূরত্ব সৃষ্ট হওয়া শুরু করলো। তাকে না দেখলে , কথা না শুনলে ভালই লাগতো না। রেখা যে আমার মনের মধ্যে একটি আনন্দের , ভালোলাগার বন্যা ছিল। রেখাকে এক মুহূর্ত দেখার জন্য মনটা খুব ছটফট করতো।

আমার ডিপার্টমেন্টের বন্ধু-বান্ধবীরা অবশ্য আমার আর রেখার ব্যাপারটা ভালভাবেই অনুধাবন করত। রেখার প্রতি যে আমার কখন ভালোলাগা থেকে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে বুঝতেই পারি নি। কখনই মুখ ফুটে বলতে পারিনি যে রেখা আমি তোমাকে ভালোবাসি ।

রেখা তার চাকুরী নিয়ে খুবই ব্যস্ত এখন। একদিন আমার অনুপস্থিতিতে আমার ডিপার্টমেন্টের বন্ধু-বান্ধবীরা রেখাকে আমার ভালোবাসার কথা এবং তার সম্পর্কে আমার অনুভূতির কথাগুলো বলে দিয়েছিল। অনেকদিন রজনীগন্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম কিন্তু রেখা আর আসতো না । একদিন আমার সেই অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো, যথারীতি সে গোলাপ নিয়ে হাজির । সে আমাকে বলল আমি কেমন আছি, তাকেও আমি জিজ্ঞেস করলাম তার কি অবস্থা এখন? সে সদুত্তর দিল। কিন্তু সে আমাকে গোলাপটি আমার হাতে দিলো আমিও দিলাম রজনীগন্ধাটি । হঠাৎ কি যেন হলো দু’জনে দুজনার দিকে থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। এভাবে কেটে গেল অনেকক্ষণ।

ঘোর কাটিয়ে সে আমাকে বলল তুই আমাকে ভালোবাসিস? তার এই প্রশ্নটি শুনে প্রথমে আমি হতবম্ব হয়ে আমতা আমতা করছিলাম। আমি মনে মনে ভাবছি এই মেয়ে বলে কী!

আমি রেখাকে বুঝিয়ে বললাম দশ বছর পর তুই এসব কি বলছিস?


আরও পড়ুন : জেগে উঠে বেরিয়ে আয় (কবিতা)
আরও পড়ুন : এই না হলে বর্ষাকাল কি হয়?

এতোদিনে কি তুই কিছুই বুঝিস নি? আমার ভাবভঙ্গিতে ,কথায় কি তুই কিছুই বুঝতে পারলিনা ; আমি তোকে কতটা ভালোবাসি?

এসব শুনে সেদিনের মতো রেখা চলে গেল। আমি তার যাওয়ার পথ পানে চেয়ে রইলাম, আর অপেক্ষায় থাকলাম তার উত্তরের,

আমার লেখাপড়া স্নাতক(সম্মান) শেষ হলে স্নাতকোত্তরও উত্তীর্ণ হলাম। একটি চাকুরীও পেয়ে গেলাম। আবার দেখা আমাদের, এবেলায় রেখা আমাকে বলে যে কত বেতনে চাকুরী করি , বললাম শতেরশত পঞ্চাশ টাকা বেতনে। রেখার চাকুরীর বয়স বেশি হওয়ায় সে আমার থেকে বেশি বেতন পেত। আমি রেখাকে এতই ভালবাসতাম যে তাকেই জীবনসঙ্গী করার জন্য ঠিক করেছিলাম। কিন্তু রেখার কাছে কোন সদুত্তর না পাওয়ায় আমার চাকুরীর এক বছরের মধ্যে অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করি। বিয়ের পরেই টনক নড়ে রেখার। সে আমার জন্য ছটফট করতে লাগলো , সাথে আমার বন্ধুরাও অস্থির হতে লাগলো ,যে এটা কী হলো! যেখানে রেখার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার কথা তা হলো না । রেখা হয়তো অনেক কষ্ট পেয়েছিল আমি অন্য কোথাও বিয়ে করাতে। আমার বিয়ের  প্রায় ৫-৬ বছর পর রেখাও বিয়ে করলো । সে যে ছেলেটিকে বিয়ে করেছিল কোনদিন তাকে দেখেও নি ,চেনেও না । আর আমি চাকুরীর প্রথম দিকে যতো বেতন পেয়েছিলাম, রেখার স্বামীও ঐ একই বেতনে চাকুরী করতো। তারপর অনেকদিন আর আমাদের মধ্যে কোন যোগাযোগ হয় নি। একদিন বিকেল বেলাইয় আমি শহরের পথ ধরে আমার ছেলেকে নিয়ে হাটছিলাম দেখি রেখা কোথা থেকে যেন হন্তদন্ত হয়ে আমার মুখোমুখি হলো। আমাদের কুশল বিনিময় শেষ হলে তাকে আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণ দিলাম । রেখা একদিন হঠাতই আমার বাড়িতে চলে আসলো , আমি তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানালাম, আপ্যায়নের কোন কমতি ছিল না । লক্ষ্য করলাম তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে মানে মুটিয়ে গিয়েছিল । আমার স্ত্রী বললো যে রেখা নাকি সন্তান সম্ভবা।

রেখার এখন দুই সন্তান; একটি মেয়ে আর একটি ছেলে। মেয়েটি শহরের একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে। আর ছেলেটি এখনও ছোট । আরেকদিন রেখা তার মেয়েকে নিয়ে আবার আমার বাড়িতে আসে । আমি এখন একটি বড় চাকুরী পেয়েছি। রেখার মেয়ে আমাকে বলে আঙ্কেল আপনি তো অনেক টাকা পান এখন তাই না? আমি বললাম এই তো মামনি চলে যায় সংসার। তুমিও ভালো করে লেখাপড়া করো তুমিও খুব ভালো চাকুরী পাবা। বাস্তবতা অনেক কঠিন মামনি; অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে।

আমার যে মাসিতো ভাই ;সেও অনেকদিন রেখার পিছনে তার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ঘুরেছিল কিন্তু সে ব্যর্থ হয় কারণ রেখা আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না । এখন আমারও দুই সন্তান নিয়ে সুখের সংসার । রেখাকে দেয়া আমার ২০৪ খানা চিঠি ফেরত দিয়েছিল। আমার লেখা অধিকাংশ চিঠিগুলোতে ছিল তাকে নিয়ে কবিতার লাইন ও শৈল্পিক নিপুণতা । একদিন আমার মাসিতো ভাই চিঠিগুলো নিয়ে আগুনে পুড়ে ফেলে যাতে কোন স্মৃতি না থাকে কিন্তু আমি ঐ চিঠিগুলো থেকে ২০ খানা চিঠি সংরক্ষণ করেছিলাম । যেগুলো দেখলে আজো আমি আবেগপ্রবণ হয়ে যাই। মনে হয় আমার সেই অসমাপ্ত বাসনার কথা । এই চিঠিগুলো একটি একটি করে আমার স্ত্রীকে পড়তে দিতাম বলতাম এগুলো কার লেখা। কারণ আমার স্ত্রীও বুদ্ধিমতী। সে বুঝে ফেলেছিল এগুলো রেখাকে লেখা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন বিষয় গোপন রাখা উচিত নয় , এতে সংসারে অশান্তি বাড়ে। গভীর রাতে যখন স্ত্রী-সন্তানেরা শান্তিতে ঘুমায় তখন আমি আর রেখার রাতগুলো যে কত কষ্টে কেটে যায় সেটা শুধু আমরা দু’জন এবং সৃষ্টিকর্তা জানে।

চিঠি পড়া শেষ হলে আমার স্ত্রীর হঠাৎ মাথা ব্যাথা শুরু হয়, মূর্ছা যায় প্রায়। কোন স্ত্রি চায় না তার স্বামীর ভালোবাসায় অন্য কেউ ভাগ বসাবে। এভাবে জীবন চলমান রইল। আমি আর রেখার কথা তুলে স্ত্রীকে বললাম তোমার কি আজও মাথা ব্যাথা শুরু হয়েছে ?

এ বিষয়ে আরো খবর