সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় বিপদমুক্ত

মোঃ শহর আলী 02.Jan.2021; 11:12:09

শনিবার সকালে বাড়ির জিমে ট্রেডমিলে হাঁটার সময় বুকে ব্যথা হওয়ায় আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন সৌরভ। তিনি নিজেই দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ফোন করেন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে চলে আসতে বলা হয়। সৌরভ নিজেই হাসপাতালে চলে আসেন। দেখা যায়, তাঁর হৃদ্‌পিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী তিনটি ধমনীতে ‘ব্লকেজ’ রয়েছে। তার মধ্যে একটিতে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করে ‘স্টেন্ট’ বসানো হয়েছে। বাকি দু’টিতেও ‘স্টেন্ট’ বসানো হবে বলে হাসপাতাল সূত্রের খবর। সেগুলি সোমবার বসানো হতে পারে। আপাতত সৌরভ স্থিতিশীল। অসমর্থিত সূত্রের খবর, সৌরভকে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য মুম্বই নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তবে সে সবই নির্ভর করছে তাঁর শারীরিক অবস্থার উপর। এখন আরও অন্তত চার-পাঁচদিন তাঁকে হাসপাতেলই থাকতে হবে।  

চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই ধরনের অসুস্থতায় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ হল অসুস্থতার পরের ছ’ঘণ্টা। মৃদু হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। অনেক সময়ে মনে হয়, গ্যাসের সমস্যা হয়েছে। ফলে অনেকেই অ্যান্টিসড বা ওই ধরনের ওষুধ খেয়ে নেন। আসল অসুস্থার কোনও চিকিৎসা হয় না। ছ’ঘণ্টা ওই অবস্থায় থাকলে কিন্তু বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তবে ওই অসুস্থতার ছ’ঘন্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু হলে বড়সড় বিপদ এড়ানো যায়। সৌরভের ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। সৌরভ নিজেই হাসপাতালে ফোন করেছিলেন বলে বড় বিপদ এড়ানো গিয়েছে। ফলে সৌরভ আপাতত স্থিতিশীল। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, সৌরভ ভাল আছেন। স্থিতিশীল। রক্তচাপ এবং নাড়ির গতি স্বাভাবিক আছে। সৌরভের চিকিৎসায় পাঁচজনের একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠিত হয়েছে। বোর্ডের সদস্য আফতাব খান বলেছেন, ‘‘উনি একটা মৃদু হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু উনি নিজেই ফোন করে হাসপাতালে চলে আসেন। তাই বড় বিপদ এড়ানো গিয়েছে।’’

আফতাব আরও বলেন, ‘‘ওঁকে লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া দিয়ে স্টেন্ট বসিয়েছি। উনি সজ্ঞান এবং সচেতন আছেন। আমাদের সঙ্গে কথাও বলেছেন। উনি বেশ কয়েকদিন ধরেই সপ্তর্ষি বসুর চিকিৎসাধীন ছিলেন। অসুস্থতা বোধ করায় উনি সপ্তর্ষিকে ফোন করেন। তার পর সপ্তর্ষির সঙ্গেই উনি হাসপাতালে চলে আসেন। আমরা ওঁকে প্রাথমিক ভাবে বিপন্মুক্ত করেছি।’’ বাইপাস সার্জারির কথা ভাবা হচিছএ কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে চিকিৎসকেরা বলেন, ‘‘এখন বাইপাস সার্জারির কথা আমরা ভাবছি না। আমরা স্টেন্ট বসানোটাই উপযুক্ত মনে করেছি। আমরা আপাতত ওঁকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে চাই।’’ চিকিৎসার পর সৌরভ পুরোপুরিই সুস্থ হয়ে যাবেন বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের কথায়, ‘‘উনি একেবারেই সুস্থ হয়ে যাবেন। আবার চাইলে ক্রিকেটও খেলতে পারবেন।’’

জানা গিয়েছে, সৌরভের পরিবারে ইসকিমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। সাধারণত হৃদযন্ত্রে ধমনীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রক্ত না পৌঁছলে মানুষ অল্পেতেই হাঁফিয়ে পড়ে। এই অবস্থায় একটু বেশি পরিশ্রম করলে বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়ে মানুষ। সৌরভের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। অনেক সময়েই ইসকিমিয়া হওয়া সত্ত্বেও মানুষ বুঝতে পারে না। নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে হাসপাতালে ফোন করায় সৌরভ আপাতত স্থিতিশীল বলেই চিকিৎকেরা মনে করছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সৌরভের ‘পিসিআই’ পরীক্ষা হয়েছে। তাঁর তিনটি ধমনী ‘ব্লক’ হয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যে একটি ধমনীতে প্রায় ৯০ শতাংশ ব্লকেজ ছিল। সেখান থেকেই সমস্যা বলে চিকিৎসকেরা মনে করছেন। এদিন সৌরভ যখন হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন তাঁর নাড়ির বেগ ছিল মিনিটে ৭০। রক্তচাপ ছিল ১৩০/৮০। শরীরের অন্যান্য পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক এসেছে বলেই হাসপাতালের মেডিক্যাল বুলেটিনে জানানো হয়েছে।

এমনিতে বয়স ৪৫ পেরোলে কিন্তু হার্ট অ্যাটাক হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, এই বয়সে অনেক রকমের রিস্ক ফ্যাক্টর তৈরি হয়। তবে সকলের ক্ষেত্রেই হয়, এমনটা নয়। সৌরভের ক্ষেত্রে এই ফ্যাক্টরগুলো অনেকটাই কম বলে আমার ধারণা। প্রথমত, ডায়বেটিক নন। দ্বিতীয়ত, ধূমপান করেন না। তবে এ ক্ষেত্রে পারিবারিক রিস্ক ফ্যাক্টর হার্ট অ্যাটাকের কারণ হয়ে থাকতে পারে। আমি জানি, সৌরভের বাবা চণ্ডী গঙ্গোপাধ্যায়ের হার্টের সমস্যা ছিল। হার্টে রক্ত চলাচলের সমস্যা ছিল তাঁর। ফলে, সৌরভের অনেকটাই সাবধানে থাকা উচিত। উচিত নয়, সাবদানে থাকাটা ওঁর ক্ষেত্রে জরুরি।

সৌরভের যেটা হয়েছে, চিকিৎসার পরিভাষায় তাকে ‘মায়োকার্ডিয়াল ইনফারকশন’ বলে। আঙুলে চেপে সুতো বেঁধে দিলে যেমন রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, ব্যথা হয়, আঙুলের অনুভূতি চলে যায়, এ ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমন। হার্টের কোনও এলাকায় যখন রক্ত প‌ৌঁছয় না, তখন ব্যথা শুরু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় হার্টের পেশি। তখনই হার্ট অ্যাটাকের মতো সমস্যা দেখা যায়। হাসপাতালের বিবৃতি বলছে, জিম করার সময় সৌরভ আচমকাই অসুস্থতা বোধ করেন। ব্ল্যাক আউটও হয়ে যান। এই ব্ল্যাক আউট ব্যাপারটা তখনই হয় যখন আমাদের হার্ট রেট অত্যন্ত কমে যায়। সাধারণ ভাবে এক জন সুস্থ মানুষের হার্ট রেট ৭৫ বা ৮০। সেটা যদি আচমকাই ৩০-এ নেমে যায়, তখন হৃৎপিণ্ড এতটাই স্তিমিত হয়ে যাবে যে মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছবে না। তখনই এই অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা ব্ল্যাক আউট হতে পারে। পুরো ব্যাপারটাই কিন্তু চেন সিস্টেমে হতে থাকে। আর এই সিস্টেমের প্রথম ধাপ ধমনীতে ব্লকেজ। তার পর রক্ত সরবরাহ বন্ধ হওয়া। তার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশি। পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে হৎপিণ্ডের স্বাভাবিক ছন্দ হারায়। গতি কমতে থাকে। এই গতি বা হার্ট রেট অত্যন্ত কমে গেলেই কিন্তু ব্ল্যাক আউট।


আরও পড়ুন : ভিক্ষুক নেতা কাউন্সিলর প্রার্থী!
আরও পড়ুন : রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের 30 শতাংশ কাজ শেষ

সাধারণত কোলেস্টরল জমেই রক্ত জমাট বাঁধে। সরু হয়ে আসা ধমনীতে রক্ত চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায় ধীরে ধীরে। তাই ব্লকেজ এড়াতে কোলেস্টরল বাড়ে এমন কিছু এড়িয়ে চলাই ভাল। তবে মুশকিল হল এমন অনেক কিছুই আছে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও শরীরে কোলেস্টরল পুরোমাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করে। বিশেষ করে মানসিক চাপ, অবসাদ, অত্যন্ত বেশি পরিমাণে শারীরিক কসরত বা পরিশ্রম—এই বিষয়গুলো অনেক সময়েই দেখা যায় যে, ছোটখাটো ব্লকেজকেও মারাত্মক আকার দিয়ে দিচ্ছে। পৌঁছে দিচ্ছে ক্ষতিকর জায়গায়। তাই খেয়াল রাখা জরুরি।

সৌরভের মেডিক্যাল রিপোর্টে হাইপোকাইনেসিয়ার কথা বলা হয়েছে। এই হাইপোকাইনেসিয়া মানে হল হার্টের একটি অংশ ভালে কাজ করছে না। কারণ হার্টের পেশি খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হার্টের পেশিই কিন্তু তাকে পাম্প করতে সাহায্য করে। এ জন্য এই পেশির প্রচুর অক্সিজেন আর রক্ত প্রয়োজন হয়। ধমণী যদি সেই রক্ত সরবরাহ না করতে পারে, যদি পেশি আধপেটা খেয়ে থাকে তা হলেই তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রভাব ফেলবে হার্ট রেটে। ধরা যাক হার্টের ১০০টি পেশির মধ্যে ২০টি ক্ষতিগ্রস্ত হল, এই বিষয়টিকেই আমাদের সহজ ভাষায় বলব হার্ট অ্যাটাক।

যা জানতে পেরেছি, সৌরভের তিনটি ধমনীতে ব্লকেজ রয়েছে। ফলে ওঁর চিকিৎসা কোন পদ্ধতিতে হবে তা নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠেছে। এখন যদি সারা পৃথিবীর গবেষণা মানা হয়, তবে দেখা যাবে দীর্ঘমেয়াদে তিনটি ধমণীর ব্লকেজ সারাতে বাইপাস সফল। কিন্তু, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তিনটি ধমণীতে ব্লকেজ থাকলেও তার প্রতিটিই তেমন জটিল নয়। এই ধরনের কম জটিল ব্লকেজগুলোকে নন কমপ্লেক্স ব্লক বলে। সৌরভের যদি নন কমপ্লেক্স ব্লক থেকে থাকে তবে সেখানে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করার কথা ভাবা যেতে পারে।

সৌরভের অসুস্থার খবরে চমকে উঠেছে গোটা দেশ। হাসপাতালে ভিড় করেছেন তাঁর অনুগামী এবং ভক্তরা। স্ত্রী ডোনা এবং কন্যা সানা সারাক্ষণই তাঁর সঙ্গে রয়েছেন। সৌরভের দ্রুত আরোগ্য কামনায় টুইট করেছএন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সৌরভের প্রাক্তন সহ ক্রিকেটাররা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সৌরভকে নয়াদিল্লির এমসে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সৌরভের পরিবার সূত্রের খবর, আপাতত তিনি বিপন্মুক্ত এবং স্থিতিশীল। আগামী সোমবার তাঁর আরও দু’টি ধমনীতে স্টেন্ট বসানো হবে কি না, তা ঠিক করা হবে। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহে এটা অনস্বীকার্য যে, ‘গোল্ডেন আওয়ার’ চিনতে সৌরভের ভুল হয়নি। সম্ভবত তাঁর ক্রিকেটীয় ইনস্টিংক্ট এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে ফোন করিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে।

সূত্র: আনন্দবাজার

এ বিষয়ে আরো খবর